এখন ফিরে ভাবলে মনে হয়, চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে শুধু আমার প্রবল প্রতিবাদী মনোভাবই ছিল না।

একটা ঘটনা ছিল, যা জীবন বদলে দেবে তখন ভাবতেই পারিনি। আঠাশ বছর বয়সে কৃত্রিম টোপ দিয়ে মাছ ধরা শিখেছিলাম।

শুধু আরও একটা শখ চেয়েছিলাম। অবসরে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে একটু মাছ ধরি, জীবনের ছোটখাটো ঝামেলা থেকে দূরে থাকি।

ভাবিনি, পরে সেই দিনগুলো জীবন, ভয় আর নিজের চলে যাওয়ার কারণ বোঝার অংশ হয়ে উঠবে।

উহানের ইয়াংসি নদীর ধারে বারবার নিজের চোখে মানুষকে সেতু থেকে লাফ দিতে দেখেছি।

তাদের নাম জানতাম না, কোথা থেকে এসেছে জানতাম না, আগে কী সহ্য করেছে তা তো আরও নয়।

শুধু জানতাম, খবরের গল্প নয়, একজন সত্যিকারের মানুষ, যে একসময় আমাদের মতো নিজের জীবন কাটাত।

পুলিশে ফোন করেছি। কখনও লাইন ব্যস্ত, যত চেষ্টাই করি যোগাযোগ হয় না। পরে এমন অবস্থাও দেখেছি, যেখানে আশেপাশে আর কেউ ফোন করে না, আমিও না।

Douyin-এ পোস্ট করে প্রশ্ন করেছি, এমন সময় পুলিশের নম্বরে যোগাযোগ হয় না কেন। দশ লাখবার দেখা হয়েছিল, কিন্তু প্রচার সীমিত করা হল, মন্তব্য মুছে দেওয়া হল।

ভয় শুধু সামনে ঘটতে থাকা ঘটনায় নয়, সেই অসহায়তাতেও। জানো কারও সাহায্য দরকার, কিন্তু বোঝো না আর কী করতে পারো।

নিজে তোলা দুটি ভিডিও এখনও রেখেছি। পরে সেই মানুষদের নথিভুক্ত করা হয়েছে কি না, পরিসংখ্যানে গেছে কি না, যাচাই করার উপায় নেই।

কিন্তু চাই না, শেষে তারা শুধু এমন ভিডিও হয়ে থাকুক যেটা মানুষ স্ক্রল করে পেরিয়ে যায়।

পৃথিবীতে আসা একজন মানুষের স্মৃতি শুধু ‘কেউ সেতু থেকে লাফ দিয়েছে’ কথাটায় সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত নয়।

আঠারো-উনিশ বছর বয়স থেকে নেটওয়ার্ক সেন্সরশিপ এড়ানোর প্রযুক্তি জানতে শুরু করি। বিনামূল্যের সরঞ্জাম বানিয়েছি, পরে অনেক সংশ্লিষ্ট কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণেও যুক্ত ছিলাম।

চেয়েছিলাম মানুষ ভিন্ন তথ্য জানার সুযোগ পাক, আর আমিও নিরাপদে পছন্দের কাজ করে টাকা রোজগার করে পরিবারকে ভালো জীবন দিতে পারি।

নিজেকে কখনও না-ভয়-পাওয়া, চিরদিন অটল মানুষ হিসেবে লিখতে চাই না।

নিজের বিশ্বাস আছে, আবার হারাতে চাই না এমন অনেক কিছু আছে।

লকডাউনের সেই প্রতিবেশীর কথা এখনও মনে আছে, যিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জরুরি চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে চেয়েছিলেন।

তাঁকে চিকিৎসার জন্য বেরোতে দিতে গাড়ি দিয়ে আবাসনের প্রবেশপথের লকডাউন বাধা ভেঙেছিলাম। পরে এর জন্য বারবার তলব করা হয়।

তখন বিরাট কিছু করার কথা ভাবিনি। শুধু মনে হয়েছিল, মানুষ অসুস্থ, আগে ডাক্তার দেখাতে দিতে হবে। অন্য বিষয় আগে ভাবার ছিল না।

ইয়াংসি সেতু থেকে লাফ দেওয়া মানুষ, চিকিৎসা-প্রয়োজনীয় প্রতিবেশী আর পরে আমার নিজের ঘটনা স্মৃতিতে ধীরে ধীরে যুক্ত হল। একটা সহজ প্রশ্ন বেশি ভাবায়: সাধারণ মানুষ অতিক্রম করতে না-পারা বিপদে পড়লে কার সাহায্য চাইবে, আর উত্তর পাবে কি?

২০২৪ সালের আগস্টে পুলিশ আমাকেও নিয়ে গেল। আগে নদীর ধারে অপরিচিতদের জন্য ভয় আর দুঃখ পেতাম, পরে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পেতে শুরু করি।

সেই ভয়ের বড় ব্যাখ্যা দরকার নেই। খুব নির্দিষ্ট: আবার স্বাধীনতা হারাব কি না, পরের বার বাড়ি ফিরতে পারব কি না, স্ত্রী আর মেয়েকে আরও কতবার আমার জন্য চিন্তা করতে হবে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আবার তলবের নোটিশ পাই, ১৬ ডিসেম্বর শানডংয়ের শিয়াজিন যেতে বলা হয়। আগের অভিজ্ঞতায় ভয় ছিল, আবার আটক করবে, মেয়ের থেকে দীর্ঘদিন আলাদা হতে হবে। এটাই সঙ্গে সঙ্গে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সরাসরি কারণ।

মামলার বিবরণ নথিতে লেখা যায়, সময় তালিকায় সাজানো যায়, নোটিশ স্ক্যান করে রাখা যায়। কিন্তু বাবা যখন ভাবেন মেয়ের বড় হওয়ার সময় পাশে থাকতে পারবেন না, সেই ভয় লিখিত ভাষায় ধরা কঠিন।

মেয়েকে বড় হতে দেখতে চাই, স্কুলে পৌঁছে দিতে চাই, বড় হওয়ার ছোট ছোট কথা শুনতে চাই।

চাই, একদিন পেছন ফিরে বাবাকে খুঁজলে সে যেন আমাকে দেখতে পায়।

আবার স্বাধীনতা হারানোর ভয়, পরিবারের আরও কষ্টের ভয়, স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া দিনগুলো হঠাৎ আর ফিরে না-পাওয়ার ভয়।

ভয় পাই বলার মানে ভবিষ্যতে কী হবে নিশ্চিত জানি তা নয়। বরং পরিবারের সঙ্গে থাকার সম্ভাবনা হারানো আরও অসহনীয় লাগে।

ভয় ছিল না বলে যাইনি। ঠিক ভয় ছিল, প্রিয়জন ছিল, আরও আনন্দে বাঁচতে চেয়েছি বলেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

এই ঘটনাগুলো লিখলে মাত্র কয়েকটি লাইন।

কিন্তু আমার কাছে তারা দুই জীবনের সীমা। একদিকে পরিচিত ভাষা, রাস্তা, জন্মভূমি; অন্যদিকে নতুন করে খুঁজতে হবে এমন আশ্রয়।

নিশ্চিন্তে বাঁচা গেলে কে সহজে সব পরিচিত জিনিস পেছনে ফেলে যাবে?

এখন ২০২৬। প্রতিদিন শুনি অর্থনীতি খারাপ, মানুষ আয় করতে পারছে না। আজ প্রতিটি পরিবারের অবস্থা জানি না, মৃত মানুষদের জীবন তাঁদের হয়ে ব্যাখ্যাও করতে পারি না।

শুধু চিন্তা না করে পারি না: দু-তিন বছর আগেই যাদের বাঁচা কঠিন ছিল, এখন কি আরও কঠিন?

সাধারণ পরিবারের জীবন ভালো কি না শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ব্যাপারেই বোঝা যায়: চাকরি থাকবে কি না, পরের মাসের ভাড়া জুটবে কি না, পরিবারে অসুখ হলে ডাক্তার দেখাতে সাহস হবে কি না, সন্তানের দরকারি জিনিস কেনা যাবে কি না।

শুধু চাই, সারাদিন কাজ শেষে মানুষ নিশ্চিন্তে খেতে পারুক, সন্তানের সামনে বাবা-মাকে সবসময় কষ্ট লুকোতে না হোক, বিপদে সাহায্য চাওয়া মানুষ কার্যকর উত্তর পাক।

চলে এসেছি, কিন্তু তাই বলে সেখানকার মানুষের জন্য কষ্ট পাওয়া বন্ধ হয়নি।

জন্মভূমির কষ্ট বাড়ুক, যাতে নিজের চলে যাওয়া ঠিক প্রমাণ করি, তাও চাই না।

বরং চাই, একদিন যে বিষয়গুলো আমাকে ভয় দিয়েছে সেগুলো কমুক, থেকে যাওয়ার কারণ বাড়ুক।

চাই সেখানকার সাধারণ মানুষ স্থির জীবন পাক, আত্মীয়-বন্ধুরা বলুক দিন বদলেছে, জানতে পারি বিপদে কেউ সময়মতো সাহায্য পেয়েছে।

কারণ সেখানে এখনও আমার টান আছে। চেনা-অচেনা সবার নিজের পরিবার আছে, ছাড়তে না-চাওয়া জীবন আছে।

এখন এসব বলা পরের কথা।

আমার কোনো বড় উপসংহার নেই, শুধু খুব সাধারণ অথচ খুব আন্তরিক একটি ইচ্ছে রয়ে গেছে।

যাদের সাহায্য দরকার, তাদের যেন বারবার নিরাশ না হতে হয়।

কষ্টে বাঁচা মানুষের জীবনে যেন ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে।

বিশেষ করে আমার দেশের মানুষের আগামী দিনগুলোতে কষ্ট কম, স্থিরতা বেশি, আশা করার মতো আগামী বেশি হোক।

‘ভালোভাবে বাঁচা’ যেন এমন ইচ্ছে না হয়, যা পূরণে একজনকে সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করতে হয়।